রবিবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০০৮

আঞ্চলিক কৃষির বিকল্প নেই



আঞ্চলিক কৃষির বিকল্প নেই


২০০৮ সালের শুরুতেই জানা গেল, পৃথিবীর ৩৩টি দেশে খাদ্যের তীব্র সংকট চলছে। তারমধ্যে বাংলাদেশের নামও ছিল। দেশ স্বাধীনের পরে গবেষণাধর্মী উন্নত জাতের ধান আবিষ্কার ও তাতে উন্নত সার-কীটনাশকের ব্যবহার করে মাঠে মাঠে সোনালি ধানের উৎপাদন শুরু করা হয়। বর্তমান ১৫ কোটি মানুষের জন্য যে ৩ কোটি মেঃ টন ফসলের উৎপাদন করা হচ্ছে তাতেও আমরা আমাদের অভাব দূর করতে পারছি না। কেননা প্রতি বছর প্রায় ২৫ লক্ষ বাড়তি মানুষ আর উৎপাদিত জমি হারাচ্ছি। যে জন্য যতই উচ্চ ফলনশীল জাতের ফসল আসুক না কেন অভাব আমাদের সাথের সাথী। যখন আমাদের দেশে ২০ কোটি মানুষের বাস হবে তখন খাদ্যের প্রয়োজন হবে ৩·৬৪ কোটি মেঃ টন। এখন প্রতি হেক্টরে ধানের উৎপাদন ফলন ৩·৩ থেকে ৪·০ মেঃ টন, বাড়তি এ মানুষের কারণে ওই পরিমাণ জমিতে খাদ্য উৎপাদনের প্রয়োজন হবে ৪·৪ থেকে ৫·৩ মেঃ টন। অথচ প্রতি বছর বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অন্যান্য কারণে আবাদি জমি কমে আসছে। সে জন্য দেশের নিশ্চিত খাদ্য নিরাপত্তার জন্য অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি অঞ্চল ভিত্তিক অনুকূল আবহাওয়ায় কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে নজর দিতে হবে।

দিনাজপুর ধান উৎপাদনের স্বর্গভূমি। সেখানে প্রতি ইঞ্চি জমির ব্যবহার করে ধান উৎপাদন করা যায়। যশোর ও নরসিংদিতে সবজি-কলা ভাল হয়। এখানে সম্পূর্ণ জমির ব্যবহার করে এই ফসল বাড়াতে হবে। কুমিল্ল্লায় এক জমিতে বছরে অনেকবার ফসল উৎপাদন হয়ে থাকে। দেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি জমিতে বছরে ২টি ফসল ফলানো সম্ভব। অথচ এখানে যে বিশাল কৃষিক্ষেত্র অনুউৎপাদন অবস্থায় থাকে, তা গরিব এ জাতির জন্য অভিশাপ। এ অঞ্চলে সাথী ফসল ও আইল ফসল চাষের উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। লাগসই প্রযুক্তির মাধ্যমে মঙ্গাপ্রবণ এলাকাতে কৃষি জমির পরিপূর্ণ ব্যবহার করলে অর্থনীতিতে তা আর্শীবাদ হয়ে কাজ করবে। মুন্সিগঞ্জ জেলাতে উর্বর যে জমি রয়েছে তাতে আলু উৎপাদনের পরেই বিনা চাষে ভুট্টোর আবাদ করলে ভাল হয়। দক্ষিণাঞ্চলে রয়েছে আমাদের দেশের তরল সম্পদের সমারহ। জল ও মাটির লবণাক্ততাকে সাথে নিয়ে এখানকার কৃষকেরা যে চাষাবাদ পদ্ধতির নিমন্ত্রণ জানিয়েছে, তাকে আরও বি-ৃতি ঘটানোর জন্য পদক্ষেপ নেয়া না গেলে দেশের সম্পদ ব্যবহারে পরিপূর্ণতা আসবে না। পার্বত্য অঞ্চল আমাদের দেশের মোট জমির শতকরা ১২ ভাগ নিয়ে গঠিত। গত বোরো মৌসুমে এখানকার সমতল ভূমিতে বাঙালিরা অনেক ধান উৎপাদন করে। মালয়েশিয়াতে পাহাড়ে পাম চাষ করে বিশ্ব অর্থনীতিতে দেশটি অবদান রাখছে। আমরাও সেটা অনুসরণ করতে পারি।

আবহাওয়া, মাটির গুণাগুণ, তাপমাত্রাসহ ফসল উৎপাদনের প্রয়োজনীয় উপকরণের কথা বিবেচনা করে অঞ্চল ভিত্তিক কোন ফসল চাষ করতে হবে তা যেমন নির্ণয় করা দরকার, আবার ভাল ফসল উৎপাদন করতে দরকার উন্নত জাতের বীজ। টিস্যু কালচার পদ্ধতির মাধ্যমে হাইব্রিড বীজের উৎপাদন ও সরবরাহ করা দরকার। শহর ও গ্রামের সম- ফাঁকা জমি এমনকি অফিস-আদালতসহ প্রতিটি বাড়ির আঙিনাতে চাষাবাদ কার্যক্রম শুরু করতে হবে।

আমাদের কৃষি ও কৃষিজ উপখাতগুলো ক্রমসংকুচিত হয়ে পড়েছে। অধিক জনসংখ্যার জন্য আজ কৃষি জমি বেহাত হচ্ছে, বন ও চাষের জমি উজাড় হচ্ছে, কীট-পতঙ্গ ও জলজ প্রাণীর বসতি ধ্বংস হচ্ছে। আর অবক্ষয়ের কারণে দেশের মাটি ও পানির শক্তি হারিয়ে গিয়ে জীববৈচিত্র নিঃশেষিত হচ্ছে। অর্থাৎ আমরা এখন স্বীকার করতে পারি পরিবর্তিত যে পরিবেশ এই দেশকে ঘিরে এগিয়ে যাচ্ছে, তাতে আমাদের কৃষিক্ষেত্র প্রভাবিত হচ্ছে। জমি যেমন সংকুচিত হয়ে পড়ার কারণে কৃষিজ উৎপাদন কমে যাচ্ছে। এজন্য পরিবেশকে স্বাভাবিক রাখতে অঞ্চল ভিত্তিক এখনই কি করণীয় তা উপস্থাপন করে, সে আলোকে পদক্ষেপ গ্রহণ করা খুবই জরুরি। পরিবেশ ছাড়াও কৃষির উৎপাদনের সাথে জড়িত প্রত্যেকটি পর্যায়কে নিয়ে সমম্বিত নীতি বা কৌশল অবলম্বন করে দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।

বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগের দেশ। ২০০৭ সালের প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন শৈত-প্রবাহে ও মঙ্গাপ্রবণ এলাকায় ধানসহ কৃষি ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। খরায় দেশের ৫ হাজার মেঃ টন ধান উৎপাদন কম হয়েছে। কালবৈশাখী ঝড়ে ৫ হাজার হেঃ জমির ফসল, ঘরবাড়ি, বৃক্ষ ধ্বংস হয়েছে। বন্যায় ১·৬৪ লাখ একর জমির ফসল শেষ হয়ে গেছে। মৎস্য সম্পদ ও ঘরবাড়ি নষ্ট হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ে ঘরবাড়ি, ক্ষেতের ফসল, মৎস্য ও পশু সম্পদের হয়েছে ব্যাপক ক্ষতি। ভৌত অবকাঠামো বিলিন হয়ে গেছে। যে ক্ষতি আগামী ৪০ বছরেও পুষিয়ে নেওয়া যাবে না।

প্রাকৃতিক দুর্যোগের এতসব কারণের পরেও আমাদের দেশে কৃষিতে যে ফসল উৎপাদন হয়, তা শুধু মাটি, আবহাওয়া, বীজ এবং কৃষকের নিজস্ব ধ্যান-ধরণার গুণে। প্রযুক্তিগত জ্ঞান অ্বেষণ করে এবং তথ্যগত আদান-প্রদানের মাধ্যমে কৃষিকে আরও সম্প্রসারণ করা সহজ হয়।

১৯৯৭ সালে আমাদের দেশে “কৃষি সম্প্রসারণ নীতি” চালু করা হয়েছে। যার লক্ষ হচ্ছে দেশের সকল সেবাদানকারী সংস্থা সকল কৃষককে তার চাহিদা অনুযায়ী সমন্বিত কৃষি সম্প্রসারণে সেবা দিতে হবে। ইতোপূর্বে এ দেশে “একটি বাড়ি একটি খামার” শ্লোগানকে দিয়ে কৃষি আন্দোলন শুরু করা হলেও তার বা-বায়ন তেমন এগোয়নি। দীর্ঘ মেয়াদে দেশে কৃষি উন্নয়নে পরিকল্পনা গ্রহণ না করার ফলে আমাদের এ খাতে কাংখিত অবদান রাখতে পারছে না। আমরা যখন আঞ্চলিক কৃষি উন্নয়নের কথা বলছি, তখন থাইল্যান্ডে “একটি গ্রামে একটি পণ্য” নামে সরকারের সফল কর্মসূচি বা-বায়ন করছে, অর্থাৎ দেশের জনগণ ভিন্ন ভিন্ন স্থান হতে প্রয়োজনীয় সকল ফসল উৎপাদন করে তা ভোগ করতে পারে। তদ্রূপ বাংলাদেশে প্রাকৃতিক বিপর্যয়, আবহাওয়াসহ অঞ্চল ভিত্তিক সহনশীল পরিবেশ বিবেচনা করে ফসল নির্বাচন করতে হবে। এভাবে প্রয়োজনীয় সকল পণ্য উৎপাদন করতে এলাকা বিভাজন ও চিহ্নিত করা এখন খুবই জরুরি, যাতে করে কোন উৎপাদনের অভাবে আমাদের অন্যের প্রতি নির্ভর করতে না হয়।

- গৌতম কুমার রায়, কুষ্টিয়া

বুধবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০০৮

নদী ও উন্নয়ন


নদী ও উন্নয়ন

নদী আমাদের কৃষ্টি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িত। আমাদের সমগ্র জীবন ব্যবস্থায়, অর্থনীতি, বাণিজ্য, যোগাযোগে অপ্রতিরোধ্য প্রভাব থাকা সত্ত্বেও উন্নয়ন নদীকেন্দ্রিক হয়নি। অনেক ড়্গেত্রেই নদীবিমুখ হয়েছে। উন্নয়ন চিন্তôায় আমরা ক্রমে ক্রমে নদী ও প্রকৃতি, ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, মানুষের চাহিদা থেকে সরে ভিন্নমুখী একটি শিকড়হীন উন্নয়ন পরিকল্পনায় সময়ড়্গেপণ করছি।পঞ্চাশের দশকে কলম্বো পস্ন্যানের মাধ্যমে উন্নয়নের মডেল উপস্থাপন করা হয়। উন্নয়ন হয়ে ওঠে শিল্পায়ন, শহরায়নের সমার্থক। উন্নয়নের হাওয়া এসে লাগলো অনুন্নত এই জাতিকে উন্নত করতে এবং পশ্চিমাকরণই ছিল প্রকৃত উদ্দেশ্য। সেই সূত্রকেই ধবন্তôরী বলে অন্ধভাবে মেনে নেয়া হয়। শিল্পায়ন ও শহরায়নের প্রবল ধাক্কায় উন্নয়ন শহরমুখী এবং রাতারাতি শিল্প স্থাপন কেন্দ্রিক হয়ে পড়লো। উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু গ্রাম, চালিকাশক্তির মূলভিত্তি কৃষি সেইসঙ্গে নদী ও নদীকেন্দ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থা। কিন্তু এসব উন্নয়ন তালিকা থেকে ছিটকে পড়লো। শিল্প স্থাপন, শহরায়ন এবং প্রযুক্তিগত অপরিকল্পিত উন্নয়ন বোঝায় পরিণত হয়। কথিত উন্নয়ন পরিকল্পনা ধ্বংস করে দিলো নিজস্ব ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, স্থানীয় শিল্প। আমাদের ধ্যান-ধারণায় যে বিষয়গুলো প্রবলভাবে উপস্থিত সেগুলো একেবারেই বিস্মৃত হয়ে গেল।উপেড়্গা করা হল হাজার বছরের নৌ-যোগাযোগকে। উন্নয়ন পরিকল্পনায় প্রধান হয়ে উঠলো সড়ক যোগাযোগ। প্রয়োজন-অপ্রয়োজনে তৈরি করা হলো ব্রিজ-কালভার্ট। নদীর স্বাভাবিক গতি, সহজভাবে নৌ-চলাচল, নদীকে বাঁচিয়ে রেখে সড়ক যোগাযোগের পরিকল্পনা না করায় নদীগুলোর স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ বাধাগ্রস্তô হয়। ফলে নদীগুলো ভরাট হয়ে যায়। নদী শাসন, নদী সংরড়্গণ, নদী উন্নয়নের কোনোকিছুতেই না গিয়ে নদী হত্যা করা হলো।ষাটের দশকে অধিক ‘খাদ্য উৎপাদন’ আন্দোলনের অংশ হিসেবে অনেক স্থানে তৈরি করা হয় বাঁধ, পোল্ডার ও এমব্যাংকমেন্ট। অবকাঠামো নির্মাণের প্রথম এক দশকে অধিক ফসল উৎপাদন হলেও দশক যেতে না যেতে প্রকল্পভুক্ত এলাকায় তৈরি হতে থাকে জলবদ্ধতা।ষাটের দশকে অপরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকাÐের নমুনা উপকূলীয় বাঁধ প্রকল্প (কোস্টাল এমব্যাংকমেন্ট প্রজেক্ট সংড়্গেপে সিইপি)। প্রকল্পের আওতায় নির্মাণ করা হয় ২ হাজার মাইল বেড়িবাঁধ, ৯২টি পোল্ডার ও ৭৮০টি সস্নুইস গেট। দড়্গিণ-পশ্চিম উপকূলীয় এলাকায় এসব স্থাপনা মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। এসব প্রকল্পে দড়্গিণ-পশ্চিমাঞ্চলে এলাকার পরিবেশ ও নদীগুলোর অবস্থানকে গুরম্নত্ব দেয়া হয়নি। পোল্ডার নির্মাণের আগে জনগণের যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম ছিল নৌপথ আর বাহন ছিল নৌকা। কিন্তু পোল্ডার নির্মাণের ফলে কাঁচা বেড়িবাঁধগুলোই হাঁটা রাস্তôা হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। পরে অপরিকল্পিতভাবে নির্মাণ হতে থাকে রাস্তôা-কালভার্ট। ফলে নদী যেমন শুকিয়ে গেছে তেমনি শুরম্ন হয়েছে জলাবদ্ধতা। এই অঞ্চলের ১২টি নদীর মধ্যে ২টি কোনোমতে টিকে আছে। বাকি নদীগুলো শীর্ণ খালে পরিণত হয়েছে। শীতকালে নদীগুলোকে চেনাই মুশকিল। শ্রীহরি, মুক্তেশ্বরী, ভদ্রা, আপার ভদ্রা, কপোতাড়্গ, চিত্রা, ভৈরব, টেকা, ভবদহ, বেত্রাবতী, হামকুড়াসহ বেশিরভাগ নদী এখন ধুঁ ধুঁ মাঠ বা শীর্ণ খালের দশা পেয়েছে। আংশিক টিকে থাকা ভৈরব ও কপোতাড়্গ নদীর তলদেশ যেভাবে ভরাট হচ্ছে তাতে আগামী দুই-এক বছরের মধ্যে এ দুটি নদীও পুরোপুরি শুকিয়ে যাবে বলে আশঙ্কা রয়েছে।জলবায়ু পরিবর্তন ও অপরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকাÐে দেশের বেশিরভাগ নদীই হারিয়ে যাচ্ছে। পলি জমে মানচিত্র থেকে হারিয়ে গেছে ১৭টি নদী। আরো ৮টি নদী অল্প সময়ের মধ্যে মরে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাম্প্রতিক জরিপে জানা গেছে, গত কয়েক বছরে দেশের ১৭টি নদী পুরোপুরি মরে গেছে। এগুলোর মধ্যে বেশিরভাগ দেশের উত্তর ও দড়্গিণাঞ্চলের। খরস্রোতা নদীগুলো এখন তাদের কঙ্কাল বয়ে চলছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সূত্রে, মৃত নদীগুলো হচ্ছে- কিশোরগঞ্জের নরসুন্দা, রাজবাড়ী-ফরিদপুরের ভুবনেশ্বর, হবিগঞ্জের বিবিয়ানা ও শাখা বরাক, শরীয়তপুরের পালঅং, কুমিলস্না ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বুড়ি নদী, যশোরের হরিহর ও মুক্তেশ্বরী, খুলনার হামকুড়া, সাতড়্গীরার মরিচাপ, লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালীর বামনী, বগুড়ার মানস, নাটোর-পাবনার বড়াল ও চিকনি, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, যশোর, খুলনা, বাগেরহাটের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ভৈরব।পানি উন্নয়ন বোর্ডের তালিকায় দেশের আরো ৮টি নদী মরে যাওয়ার পথে। এগুলো হচ্ছে- পঞ্চগড়, নীলফামারী, রংপুর, বগুড়া ও সিরাজগঞ্জের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া করতোয়া, পাবনা, মানিকগঞ্জ, ঢাকা, মুন্সীগঞ্জের ইছামতি, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, মাগুরা, নড়াইল, পিরোজপুরের কালিগঙ্গা, কুষ্টিয়া, মাগুরা, ফরিদপুর, ঝিনাইদহ, মাদারীপুরের কুমার, নড়াইল, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহের চিত্রা, যশোর ও খুলনার ভদ্রা, নেত্রকোনার সোমেশ্বরী এবং নড়াইলের নবগঙ্গা।সভ্যতার বিকাশ ও উন্নয়নের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থার একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। যোগাযোগহীন উন্নয়ন দুরূহ বিষয়। যোগাযোগের উন্নয়ন মানে অন্য একটি মাধ্যমের সম্ভাবনাকে নষ্ট করা নয়। নৌ, রেল ও সড়ক যোগাযোগের মাধ্যমে কীভাবে একটি সমন্বিত যোগাযোগ গড়ে তোলা যায়, কীভাবে মাধ্যমগুলো ব্যবহারে সর্বোচ্চ সুফল পাওয়া যায় তা আমাদের উন্নয়ন কৌশল স্থান লাভ করেনি। উন্নয়ন তাই পরবর্তী সময়ে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে এবং সুফলতার পরিবর্তে নতুন সমস্যার জন্ম দিয়েছে। উন্নয়নের জোয়ারে ভেসে গিয়েও দেখা গেছে শুধু ভাটার টান।

সরিষার চাষ পদ্ধতি

সরিষার চাষ পদ্ধতি

জমি ও মাটিঃ এঁটেল দো-আঁশ, বেলে দো-আঁশ এবং দো-আঁশ মাটিতে সফল ও অগ্রাণী জাতের সরিষা চাষ করা যায়। জমিতে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের সুব্যবস্থা থাকতে হবে।বীজ বপনের সময়ঃ অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ থেকে নভেম্বরের মধ্যে বীজ বপন শেষ করতে হবে। জমি তৈরিঃ জমিতে জো আসার পর মাটির প্রকারভেদে ৪-৬টি চাষ ও মই দিয়ে বীজ বপন করতে হবে। মাটিতে রসের অভাব হলে বীজ বপনের আগে হালকা সেচ দিতে হবে। সারের পরিমাণ ও প্রয়োগ পদ্ধতিঃ হেক্টর প্রতি সারের পরিমাণ ছকে দেয়া হলো।
এতে ফলন ২৫০০ কেজি পর্যন্তô পাওয়া যেতে পারে। সার প্রয়োগের সঙ্গে সঙ্গে পরিচর্যাও অনুসরণ করতে হবে। সারের নাম সারের পরিমাণ (কেজি/হেক্টর)ইউরিয়া ২৬৫-২৮০ কেজিটিএসপি ১৭৫-১৮০ কেজিমিউরেট অব পটাশ ৫০-৬৫ কেজিজিপসাম ২৫০-২৯০ কেজিসরিষার জমিতে সালফার (জিপসাম) প্রয়োগ উৎপাদন ৪০ শতাংশ পর্যন্তô বাড়াতে পারে। সার প্রয়োগ ও সেচ অনুক্রম , কেজি/হেক্টরসারের নাম সার প্রয়োগের সময় জমি তৈরি ৩৫-৪০ দিন বয়স ৪০-৬০ দিন বয়সজৈব সার ৭-৮ইউরিয়া ১৩৫ ১৩৫টিএসপি ১৭৫এমপি ৬০-৭০জিপসাম ১২৫-১৫০ঘাটতি দেখা দিলে বোরাক্স ৫ (স্প্রে) ৫ (স্প্রে)ডলোচুন ৩০০ মলিবডেনাম ১ (স্প্রে) (স্প্রে)পানি সেচ প্রথমবার দ্বিতীয়বারএকবার
১· অর্ধেক পরিমাণ ইউরিয়া এবং সব টিএসপি, এমপি ও জিপসাম সার জমি তৈরির সময় মাটির সঙ্গে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে।
২· বাকি অর্ধেক ইউরিয়া বীজ বপনের ৩৫-৪০ দিন পর যখন গাছে দুই-চারটি করে ফুল আসা শুরম্ন হয় তখন ছিটিয়ে দিতে হবে।
৩· ভোরে গাছের পাতায় কুয়াশা থাকে এবং সার গাছের পাতায় লেগে পাতা পুড়ে যেতে পারে, সে জন্য বিকালে সার ছিটাতে হবে।বপন বীজ পদ্ধতিবীজ ছিটিয়ে বা সারিতে বপন করা যায়। সারিতে বপন করলে লাঙলের নালা কেটে গর্ত করে গর্তে বীজ ফেলে তা ভালোভাবে মাটিতে ঢেকে দিতে হবে।সারি থেকে সারির দূরত্ব ২০-২৫ সেন্টিমিনার। সারিতে চারার দূরত্ব ৪-৫ সেন্টিমিটার রাখতে হবে। ছিটিয়ে বপন করলে ভালোভাবে মই দিয়ে বীজ ঢেকে দিতে হবে। গাছ বেশি ঘন হলে গজানোর ৭-১০ দিন পর চারা পাতলা করে দিতে হবে। চারা ভালোভাবে গজানোর জন্য ৩-৪ সেন্টিমিটার মাটির নিচে বীজ বোনা দরকার। বীজের পরিমাণছিটিয়ে বপন ৭·০-৮·০ কেজি/হেক্টরসারিতে বপন ৪-৬ কেজি/হেক্টরজমিতে আগাছা দেখা দিলে বীজ গজানোর ২০-২৫ দিনের মধ্যে নিড়ানি দিয়ে আগাছা পরিষ্কার করে দিতে হবে। পানি সেচচারা গজানোর ৩৫-৪০ দিনের মধ্যে একটি সেচ দিলে ভালো ফলন পাওয়া যায়। দেশের উত্তর অঞ্চলে বীজ বপনের ২০-২৫ দিনের মধ্যে একটি এবং তারও ২০-২৫ দিন পর আর একটি সেচের প্রয়োজন হয়।রোগ দমনবিনা সরিষার বীজ ব্যাভিস্টিন (২·৫ গ্রাম/কেজি) বা বেনলেট (১·৫ গ্রাম/কেজি) দিয়ে শোধন করতে হবে। অল্টারনারিয়া রোগের আক্রমণ বেশি দেখা দিলে ডায়াথেন এম ৪৫ বা রোভরাল স্প্রে করতে হবে। ফুল ধরা শেষ হলে ১৫ দিন পর পর দুবার স্প্রে করলেই হবে। পোকা দমনজাব পোকার আক্রমণ হলে সরিষার ফলন কমে যায়।ফুলের কুঁড়ি আসা শুরম্ন হলে এ পোকার আক্রমণ দেখা যায়। এ ড়্গেত্রে ডাইমেক্রন ১০০ ইসি বা ম্যালাথিয়ন ৫৭ ইসি প্রভৃতি কীটনাশক প্রয়োগ করতে হবে।মৌমাছি সরিষা গাছের পরাগায়নে সাহায্য করে এবং এতে ফলন বৃদ্ধি পায়।
সকাল থেকে দুপুর পর্যন্তô সরিষা ফুলে অধিক সংখ্যক মৌমাছি মধু সংগ্রহের জন্য বিচরণ করে। তাই বিকালে যখন ড়্গেতে মৌমাছি থাকে না তখন কীটনাশক ছিটাতে হবে।তেলবীজ তথা সরিষার কীটনাশক ও রোগনাশক প্রয়োগের বিস্তôারিত বিবরণ ভিন্ন অধ্যায়ে দেয়া হয়েছে। সেখান থেকে সুনির্দিষ্ট কীটনাশক নির্বাচন করে এর প্রয়োগ পদ্ধতি নির্ধারণ করতে হবে। সাধারণ চাষ পদ্ধতিতেও রোগ-পোকা দমনের বিবরণ দেয়া হয়েছে। ফসল সংগ্রহ, মাড়াই ও সংরড়্গণসরিষা গাছের ফল তথা সিলিকুয়া হলুদ রঙের হলে ফসল তুলতে হবে। মাটি নরম থাকলে সরাসরি গাছের গোড়া ধরে টেনে শিকড়সহ তোলা যায়। এ জাতটির বৈশিষ্ট্য হলো টেনে তুললেও বীজ ঝরে পড়ে না।
অন্যথায় কাঁচি দিয়ে মাটির ঠিক উপরিভাগে গাছের গোড়া কেটে দিতে হবে। তারপর ভালোভাবে শুকিয়ে বীজ সংগ্রহ করে ৪-৫ দিন রোদে শুকিয়ে সংরড়্গণ করতে হবে। ১০· ফলনএ জাতটির গড় ফলন ২·৫ টনের মতো। বীজ তেলের পরিমাণও বেশি।