রবিবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০০৮

পুকুরে গলদা চিংড়ি ও মাছের মিশ্রচাষ


পুকুরে গলদা চিংড়ি ও মাছের মিশ্রচাষ

বাংলাদেশের কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে মৎস্য সম্পদের গুরুত্ব অপরিসীম। জাতীয় পুষ্টি চাহিদা পূরণ, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং সর্বোপরি দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে মৎস্য খাতের অবদান সম্প্রসারিত করার সুযোগ আরও ব্যাপক। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন তথা রফতানি বাণিজ্যে মৎস্য খাতের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে চিংড়ি। কেননা গলদা চিংড়ি বর্তমানে দেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল। বিশ্বব্যাপী গলদা চিংড়ির ক্রমবর্ধমান চাহিদা, স্বাদ এবং মূল্যের কারণে বাংলাদেশে এর চাষ দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। এদেশে ৩৬ প্রজাতির সামুদ্রিক ও ২৪ প্রজাতির মিঠা পানির চিংড়ি রয়েছে। লবণাক্ততার কারণে সামুদ্রিক চিংড়ি দেশের উপকূলীয় এলাকা ছাড়া অন্যত্র চাষ করা যায় না।
কিন্তু মিঠা পানির চিংড়ি দেশের সব জায়গায় চাষ করা সম্ভব, এমনকি অল্প লবণাক্ত পানিতেও মিঠা পানির চিংড়ি চাষ করা যায়। মিঠা পানির সর্ববৃহৎ চিংড়ি প্রজাতি হচ্ছে গলদা চিংড়ি। আমাদের দেশে আবহাওয়া ও পানির গুণগতমান গলদা চিংড়ি চাষের জন্য খুবই উপযোগী। গলদা চিংড়ির চাষ বৃদ্ধি পেলে যেমন কর্মসংস্থান ও আমিষের যোগান বাড়বে তেমনি বৈদেশিক মুদ্রার আয় ও অনেকাংশে বৃদ্ধি পাবে। কি-ু কার্প জাতীয় এবং অন্যান্য মাছ থেকে চিংড়ির জীবনযাপন ও চাষ পদ্ধতি ভিন্ন হওয়ায় চিংড়ি চাষের জন্য কৃষকদের কারিগরি জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। এজন্য অনেক মৎস্য চwিষ চিংড়ি চাষে সফলতা অর্জন করতে পারে না।

গলদা চিংড়ি ও মাছের মিশ্র চাষের সুবিধাঃ

১· গলদা চিংড়ি মিশ্রচাষে খাদ্য এবং বাসস্থানের জন্য মাছ ও চিংড়ি কেউ কারও প্রতিযোগিতা করে না।
২· পুকুরে প্রতিটি -রের খাদ্যের যথাযথ ব্যবহার হয়।
৩· চিংড়ির বাজার দর বেশি হওয়ায় তুলনামুলকভাবে কার্প জাতীয় মাছের সাথে মিশ্রচাষ অধিক লাভজনক।
৪· গলদা চিংড়ির মিশ্রচাষে প্লাংকটনের আধিক্যের জন্য পানির গুণগতমান নষ্ট হয় না।

মিশ্র চাষের জন্য পুকুর তৈরিঃ গলদা চিংড়ি চাষের জন্য পুকুর তৈরির সময় নিম্নলিখিত বিষয়গুলোর দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে-
১· খামারে পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি নিষ্কাশন ও সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে।
২· পুকুর পাড়ের আবেষ্টনী বন্যার পানির সর্µোচ্চ উচ্চতা হতে প্রায় দেড় ফুট উঁচু হতে হবে, মাথা চওড়া এবং ঢাল এঁটেল অথবা দো-আঁশ হবে। লক্ষ্য রাখতে হবে যাতে কাঁকড়া, ইঁদুর বা অন্যান্য প্রাণী দ্বারা গর্ত করতে না পারে। ৩· সূর্যের আলো কমপক্ষে ৮ ঘন্টা থাকতে হবে। কেননা আলো ছাড়া পানিতে প্রাকৃতিক খাদ্য তৈরি হয় না। খোলামেলাভাবে বাতাস চলাচল না করলে অক্সিজেনের অভাব হবে এবং গলদা ও মাছের রোগ আক্রমণের আশংকা বেড়ে যাবে।
৪· পাড়ের নিচে বকচর থাকলে পাড় কম ভাঙ্গবে, বকচরের উপর খাদ্য দেয়া যাবে, বকচরের উপর দাঁড়িয়ে হররা ও জাল টানা সহজ হবে।
৫· পানির সুব্যবস্থার জন্য মটর কিংবা শেলো মেশিনের ব্যবস্থা করতে হবে।
৬· পুকুরের তলদেশ সমান হলে জাল টানা ও মাছ ধরা সহজ হবে।
৭· জলাশয়ে পানির গভীরতা ৩ থেকে ৪ ফুট হবে এবং বেশি গভীর হলে উৎপাদন কমে যাবে। ৮·পানির আগমন ও নির্গমন মুখে অবশ্যই প্রতিবন্ধক স্থাপন করতে হবে।
৯· ভাল উৎপাদন পাওয়ার জন্য আগাছা পরিষ্কার করা আবশ্যক।
১০· অবাঞ্চিত কিছু যাতে না থাকে তার জন্য পুকুর শুকিয়ে এবং বিষ প্রয়োগ যেমন, রোটেনন পাউডার, চা বীজের খৈল, ক্যালসিয়াম কারবাইড ইত্যাদি ব্যবহার করে দূর করতে হবে।
১১· চুন প্রয়োগ করে মাটি ও পানির অম্লত্ব নিরপেক্ষ রাখতে হবে।
১২· পরিমিত মাত্রায় সার ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
১৩· প্রাকৃতিক খাদ্য পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
১৪· পানির বিষাক্ততা পরীক্ষা করতে হবে।
১৫· খোলস বদলের সময় আশ্রয়স্থল স্থাপন করতে হবে।

গলদা চিংড়ি উৎপাদনে পানির সবচেয়ে উপযুক্ত গুণাগুণগুলো হলঃ তাপমাত্রা ২৫-৩১ ডিগ্রী সে· দ্রবীভূত অক্সিজেন ৫ পিপিএম তদুর্ধ্বê, লবণাক্ততা ০-৮ পিপিটি, সামগ্রিক ক্ষারত্ব ১০০-১৬০ পিপিএম, সমাগ্রিক খরতা ১০০ পিপিএম এর নিচে, আন-আয়োনাইজড এ্যামোনিয়া ০·০১ পিপিএম এর কম, হাইড্রোজেন সালফাইডের অনুপস্থিতি এবং লৌহ ১ পিপিএম এর কম।
গলদার খাদ্য উপাদানঃ গলদা চিংড়ির সম্পূরক খাদ্য তৈরির জন্য খাদ্যোপাদান এমনভাবে বাছাই করতে হবে যাতে সেগুলোতে আমিষ, স্নেহ, শর্করা, ভিটামিন ও খনিজ পদার্থ প্রয়োজনীয় পরিমাণে বিদ্যমান থাকে। গলদা চিংড়ির খাদ্য তৈরিতে সচরাচর ব্যবহারযোগ্য উপাদানগুলো হলঃ ফিশ মিল, রেশমকীট মিল, চিংড়ির গুঁড়া, শামুকের মাংস, কাঁকড়ার গুঁড়া, সয়াবিন খৈল, সরিষার খৈল, ভুট্রা, চালের কুঁড়া, গমের ভুষি, আটা, চিটাগুড়, ভিটামিন ও খনিজ মিশ্রণ ইত্যাদি।
পুকুরে গলদা চিংড়ি ও মাছের মিশ্রচাষ সম্পর্কিত পুি-কায় বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট এর মহাপরিচালক বলেন, রুই জাতীয় ও অন্যান্য মাছ থেকে চিংড়ির জীবনযাপন ও চাষ পদ্ধতি ভিন্ন হওয়ায় চিংড়ি চাষে চাষিদের পর্যাপ্ত কারিগরি জ্ঞানের অভাবে অনেকে চিংড়ি চাষে লাভবান হতে পারে না। ফলে তারা চিংড়ি চাষে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন। তাই পুকুরে গলদা ও মাছের মিশ্রচাষ সম্পর্কিত লেখাটি মৎস্য চাষিভাইদের সহযোগী হবে বলে আশা করি এবং এভাবে পুকুরে গলদা চিংড়ি ও মাছের মিশ্রচাষ অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখতে পারবে বলে বিশ্বাস করি।

- মোঃ শাহীন আলম, বাকৃবি, ময়মনসিংহ

কোরবাণীর ঈদ, শাইখ সিরাজ


কোরবাণীর ঈদ


আর একদিন পরেই কোরবাণীর ঈদ। ত্যাগের মহিমায় উজ্জিবিত হয়ে গোটা মুসলিম বিশ্ব এই ঈদের প্রধান কর্মসূচি হিসেবে পশু কোরবাণী করবে। প্রতিবছরের মত এবারও দেশের বিভিন্ন এলাকায় জমে উঠেছে পশুর হাট। কোরবাণী ঈদকে সামনে রেখে কৃষি ও শিল্প অর্থনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে পশু কেনাবেচার। একদিকে কৃষকের ঘরে লালন-পালন করা গরু, ছাগল ইত্যাদি প্রাণী, অন্যদিকে বৃহৎ, মাঝারি ও ক্ষুদ্র খামারে লালন-পালন করা গরু ছাগল। সব মিলিয়ে প্রাি-ক পর্যায়ে এক লাভজনক বিকিকিনির সুবিধা নিয়ে আসে এই ঈদ।

পশু হাটের মৌসুম। দেশের পশুসম্পদ খাতের অর্থনৈতিক গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একদিকে পশু, অন্যদিকে পশুর চামড়া। একটির সহউৎপাদন অন্যটি। প্রাি-ক কৃষক ও খামারিদের ঘরে নগদ কিছু টাকা আসে, অন্যদিকে বড় ধরণের লাভালাভের হিসাব কষেন চামড়া শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। এর সঙ্গে বৈদেশিক মূদ্রা অর্জনের সম্পর্ক রয়েছে।

যা হোক, কোরবাণীর পশু হাট কিংবা পশুর সমারোহে যে বিষয়টি অনাকাঙ্খিত এক খবর হয়ে দেশব্যাপী চাউর হয়েছে তা হচ্ছে নিষিদ্ধ কিছু ওষুধ প্রয়োগ করে বিভিন্ন স্থানে গরু মোটাতাজাকরণেরর প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। বিষয়টি শুধু অনভিপ্রেতই নয়, আমাদের জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক এক হুমকি। বিভিন্ন মাধ্যমের রিপোর্টে জানা গেছে, ভেরিএকটিন নামের ভারতীয় একটি নিষিদ্ধ ওষুধ খাওয়ানোর ফলে এক মাসের মধ্যেই গরুর ওজন ৩০ থেকে ৪০ কেজি পর্য- বেড়ে যায়। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, নিষিদ্ধ ওষুধ খাওয়ানোর প্রতিক্রিয়া হিসেবে গরু-মহিষের যকৃৎ ও বৃক্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্র- হয়; এগুলোতে জমে যায় পানি। ওই গরুর মাংস মানবদেহের জন্যও মারাত্মক ক্ষতির কারণ। গরু-মহিষকে পর্যাপ্ত ও নিয়মমাফিক খাবার দিয়ে অল্পদিনেই মোটাতাজাকরণ করা সম্ভব। কিন্তু কম খরচে বেশি মুনাফা লাভের আশায় যারা এই কাজ করছে তারা বড় ধরণের অন্যায় করছে, তাদের বিরুদ্ধে শাি-মূলক ব্যবস্থা গ্রহণের যৌক্তিকতা রয়েছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন এলাকার গরু খামারির সঙ্গে কথা বলেছি, যারা নিষিদ্ধ ওষুধ ব্যবহার করছে এবং যারা করছে না, এই দু’পক্ষের সঙ্গেই কথা বলে জেনেছি, নিষিদ্ধ ওষুধগুলোর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে কোনরকম অবগত করা হয়নি, সচেতন করা হয়নি। যে কারণে না বুঝেই খামারিরা ক্ষতিকর কাজটি করে চলেছে। এবারই প্রথম খবরটি বড় আকারে এসেছে। প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ কিংবা উদ্বুদ্ধ করার মত সময় এবার আর নেই। ধরে নেয়া যাক, ক্ষতি যা হবার হয়েই গেছে। কিন্তু পরবর্তীতে এ ধরণের প্রবণতা যাতে রোধ করা যায়, সে ব্যাপারে সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

সাম্প্রতিক সময়ে পশুখাদ্যে বিভিন্ন ভেজাল ও নিম্নমানের ক্ষতিকারক দ্রব্য মেশানোর খবরও আমরা পেয়েছি। বাজারে যেসব পশুখাদ্য পাওয়া যায় এর মধ্যে এন্টিবায়োটিক গ্রোথ হরমোন, হাড়ের গুঁড়া, শক্তিবর্ধক নিষিদ্ধ নানা কীটনাশক মেশানো হচ্ছে। এসব খাদ্য আপাতদৃষ্টিকে পশুর শরীরকে ভারী করে ঠিকই, কিন্তু পশুর শরীরের জন্য তা যেমন ক্ষতি ডেকে আনছে, একইভাবে মারাত্মক ক্ষতির কারণ হচ্ছে জনস্বাস্থ্যে। ভেজাল মাংসের বিষক্রিয়ায় নানান রোগে আক্রা- হচ্ছে মানুষ। এমনকি শিশু বুদ্ধি প্রতিবন্ধী হয়ে পড়ছে বলেও বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে দেখেছি আমরা।

কৃষির অন্যতম উপখাত হিসেবে পশুসম্পদ পালনের বড় একটি ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু দেশব্যাপী পশুখাদ্যের সংকট দিনের পর বাড়ছে একথা বলাই বাহুল্য। একদিকে পশুখাদ্যের ভেজালকারী অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে, অন্যদিকে দেশে নিরাপদ পশুখাদ্যের নিশ্চয়তাও সৃষ্টি করতে হবে। এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, আমিষের অন্যতম প্রধানতম উৎস্য হচ্ছে পশু পাখির মাংস, ও মাছ। এগুলোতে ভেজালের মিশ্রণ কোনভাবেই মানার মতো নয়।


- শাইখ সিরাজ
সবার কোরবাণীর মাংস হোক নিরাপদ। সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছা।

সংসদ নির্বাচনে কৃষকদের কী লাভ হবে?


সংসদ নির্বাচনে কৃষকদের কী লাভ হবে?


১৯৭০ সাল। কাগজ, চিনির দাম কমবে এমনি এক আশায় কৃষককে বলা হল নৌকায় ভোট দেওয়ার জন্য। কৃষক নৌকায় ভোট দিল। নৌকা জিতল। এরপর স্বাধীনতা যুদ্ধের সূত্রপাত হল। কৃষক স্বাধীনতার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করল। দেশ স্বাধীন হল। অনেক অনেক দিন আগের কথা। তবু মনে হয় এইতো সেদিন।
আজ ২০০৮ সাল। স্বাধীনতার ঠিক ৩৮ বছর পর আমাদের সামনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। দেশে টানটান উত্তেজনা নির্বাচনকে নিয়ে। আর এমনটা হওয়ারই কথা। সংসদহীন দেশে সংসদ আসবে। আনন্দে ভরবে সবার মন। কিন্তু আমি একজন কৃষক হিসেবে কী পাব তা কিন্তু আমার জানা নেই। কারণ আমার বাবা, দাদা ১৯৭০ সালে ভোট দিয়েছিলেন স-ায় চিনি পাওয়ার আশায়। স্বাধীনতার ৩৮ বছর পর অন্যান্য জিনিসের তুলনায় চিনি স-া তা আমি হলফ করে বলতে পারি। কিন্তু চিনি খেতে যে চাল, ময়দা লাগে তার দাম আজ আকাশ ছোঁয়া। চাল, ময়দা উৎপাদন করতে যে সার লাগে তা কৃষকের নাগালের বাইরে। বলতে গেলে দুষ্প্রাপ্য। আর কাগজ? কাগজ দিয়ে কি করব? চাষার ছেলেমেয়েরাতো দেশের ভাল স্কুল, কলেজে ভর্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত। আজ নয়, অনেকদিন আগের থেকেই। দিনদিন শহর ও গ্রামের শিক্ষার মধ্যে তৈরি হচ্ছে উঁচু প্রাচীর। এখন বড় ধরনের চাকরিতে অনেক গ্রামের ছেলেমেয়ে পাওয়া যায়। ভবিষ্যতে গ্রামের একটি ছেলেমেয়েও উচ্চ পর্যায়ের চাকরিতে পাওয়া যাবে বলে আমার মনে হয় না। কৃষকের ঘাম আর রক্তের উপর গড়ে উঠেছে যে নগর সভ্যতা, সেই নগর সভ্যতায় কৃষক আজ উপেক্ষিত। কৃষকের ভাগ্য আজ নগর সভ্যতার বেড়াজালে বন্দি। নগর সভ্যতার পদতলে বারবার আছড়ে পড়ছে কৃষকদের বেঁচে থাকার করুণ আকুতি। স্বাধীনতার পর বহু জাতীয় সংসদ নির্বাচন এসেছে। কৃষকদের বারবার স্বপ্ন দেখানো হয়েছে, কৃষকেরা আশায় বুক বেঁধেছে। কিন্তু কৃষকেরা কী পেয়েছে? আজকে কৃষকদের অবস্থা কেমন, কোন রাজনৈতিক দল খবর রাখে? রাখে না।

সারের দাম আকাশ ছোঁয়ার কারণে এবার আমন মৌসুমে কৃষকেরা সার ছাড়া আবাদ করেছে। যার ফলে ফসল কম হচ্ছে। খবরটা রাখেন কোন রাজনৈতিক নেতা, কোন রাজনৈতিক দল? এগুলোর খবর তাদের দরকার নেই। দরকার আছে নির্বাচনের। যে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদল হয়। ফলে একটা বিশেষ শ্রেণী লাভবান হয়। স্বাধীনতার পরে আমরা অনেক শুনেছি- কৃষকই জাতির মেরুদণ্ড। কই, কৃষকের ছেলেমেয়েরা যখন উচ্চ শিক্ষার জন্য ডাক্তারী, ইঞ্জিনিয়ারিং অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারে না, তখন তো আপনারা একবারও বলেন না যারা আমাদের মেরুদণ্ড (কৃষক/চাষি) তাদের ছেলেমেয়েদের জন্য মেডিক্যাল ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে আলাদা কোটা থাকতে হবে। শিক্ষাই আলো, শিক্ষার প্রতিযোগিতায় আমরা যারা চাষা, তাদের ছেলেমেয়েরা পিছিয়ে পড়ছে। গ্রাম অঞ্চলে শিক্ষায় সুযোগ-সুবিধার অভাবে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, প্রতিটি চাকরিরক্ষেত্রে চাষার ছেলেমেয়েদের জন্য আলাদা কোটা হওয়া দরকার। এটা কৃষকদের প্রাণের দাবি। মানবতার দাবি।

যারা খাদ্য উৎপাদন করে দেশ বাঁচাবে তাদের স-ানেরা থাকবে অবহেলিত তা কখনও হতে পারে না। আমরা যারা চাষা তাদের প্রাণের দাবি- আমরা যেমন দেশ উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা রাখছি, রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সুযোগ সুবিধাও আমাদের দিতে হবে। অত্য- আক্ষেপের সাথে বলছি, আমরা যখন সারের জন্য আবাদ করতে পারছি না, সেই সংকটময় অবস্থাতে কোন কোন রাজনৈতিক দল মুখ খুলে উচ্চকণ্ঠে বলেনি, সবার আগে কৃষকদের সারের সমস্যার সামাধান করতে হবে। হে শিক্ষিত সুধী, সমাজ বসবাসরত চাষারাতো তাদের নিজেদের জন্যই ফসল ফলাই না। আমাদের ফলানো ফসল খেয়ে আপনারাও বাঁচেন। আমাদের সারের সংকট নিজেদের সংকট হিসেবে বিবেচনা করার অনুরোধ করছি। স্বাধীনতার পরে যারা চাকরিজীবি, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, সবারই অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু চাষাদের অবস্থার কোন পরিবর্তন হয়নি, বরং কঠিন থেকে কঠিনতর হয়েছে। উবশী, হাইব্রিড ফসল বীজের সংকট হয়েছে, সার দুষ্প্রাপ্য, চলছে প্রযুক্তি সংকট। কৃষকেরা প্রয়োজনীয় তথ্য ও জ্ঞানের অভাবে যথেচ্ছা কীটনাশক ব্যবহার করে নিজের আর্থিক, শারীরিকভাবে যেমন ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন, তেমনি বিষক্রিয়াযুক্ত সবজি খেয়ে সমাজের সর্ব-রের মানুষও নানা রোগে আক্রা- হচ্ছে। যারা ধনী, চাকুরিজীবি, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ তাদের রোগ হলে তারা চিকিৎসা করাতে পারে। তাদের সে আর্থিক সঙ্গতি আছে। কিন্তু কৃষকের রোগ হলে কোথায় যাবে? কে আছে দরদী পাশে দাঁড়ানোর মত? চিকিৎসাইবা করবে কি দিয়ে কৃষক? টাকা কই তাদের? যাদের নুন আনতে পা-া ফুরায় তাদের আবার চিকিৎসা! তাই আমরা যারা চাষা, তাদের প্রাণের দাবি, নির্বাচনের আগে সব রাজনৈতিক দলের অঙ্গীকার করতে হবে, নির্বাচনে জিতলে সারসহ সব কৃষি উপকরণের সংকট দূর করতে হবে।

প্রযুক্তি সম্প্রসারণে, গ্রাম ও শহরের শিক্ষার বৈষম্য নিরসনে, উৎপাদিত পণ্যের ন্যাযমূল্য পাওয়ার জন্য কাজ করবেন। এগুলো বা-বায়িত হলে সংসদ নির্বাচন কৃষকদের জন্য সুফল বয়ে আনবে। না হলে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কৃষকদের কোন লাভ হবে না। আমি আশা করি রাজনৈতিক দলগুলো উপরে উল্লেখিত দাবিগুলোর প্রতি গুরুত্ব দিয়ে কৃষকদের ভাগ্য ফিরানোর জন্য কাজ করবেন। আমি স্বপ্ন দেখি এমন একটি সোনালি দিনের।


- মোঃ রফিকুল ইসলাম
কোরবাণী ও নিরাপদ পশুর মাংস