রবিবার, ২৫ জানুয়ারি, ২০০৯

দেশি মাছ রক্ষার উপায়-৩

দেশি মাছ রক্ষার উপায়-৩



এর আগে দুটি পর্বে দেশি জাতের মাছ রক্ষার কৌশলের কথা উল্লেখ করেছিলাম। আমি আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে এ লেখাগুলো লিখছি। অনুসন্ধিৎসু মন ও ব্যবসায়ীক চিন্তা থেকে আমি এ কাজগুলো করছি। কাজগুলো করতে গিয়ে মনে হয়েছে মনযোগ সহকারে কোন কাজ করলে অবশ্যই সফল হওয়া যায়। এ পর্বে পুকুরে কীভাবে শোল মাছের পোনা উৎপাদন করা যায় তার বিবরণ থাকছে-
শোল মাছের প্রজননের অভিজ্ঞতার কথাঃ ২০০০ সালে অমি বিভিন্ন হাওড়-বাওড় থেকে বিভিন্ন আকৃতির প্রায় হাজার খানেক শোল মাছ সংগ্রহ করি প্রজননের জন্য। এর আগে ১৯৯৮ সালে দেশি মাগুর ও ১৯৯৯ সালে শিং, ২০০০ সালে চিতল ও ফলি মাছের প্রজননে সফলতা পাই। আগামী পর্বগুলোতে এ বিষয়ে বিস্তারিত লেখার আশা রাখছি। শিং ও মাগুর মাছের প্রজননে সফলতাই আমাকে শোল মাছের প্রজননে উদ্বুদ্ধ করে। আগেই উল্লেখ করেছি, হাওড়-বাওড় থেকে প্রায় হাজার খানেক শোল মাছ সংগ্রহ করি। পুকুরে ব্রুড শোল মাছগুলোকে মজুদ করার পর ব্যাপক ক্ষত দেখা দেয়। তখন ছিল শীতকাল। শীতকালে শোল মাছে এমনিতেই ব্যাপক ক্ষত রোগ দেখা দেয়। বিভিন্ন চিকিৎসা শেষে মাছ সুস্থ হল কিন্তু হাজার খানেক থেকে ৮০ টির মত কংকাল সার মাছ পাওয়া গেল। কোন খাবার খায় না। খাবার নষ্ট হতে হতে পুকুরের পানি নষ্ট হয়ে গেল। অজানা পথে অনেক টাকার অপচয় করলাম। এ দিকে শোলমাছগুলোকে আমার পাকা পুকুরে স্থানান্তর করলাম। শোল মাছগুলোকে পাকা পুকুরে স্থানান্তর করার পর আরও কয়েকটি মাছ মারা গেল। কোন অবস্থাতেই খাবার খাওয়াতে পারছিলাম না। অনেক টাকা বিনিয়োগ করার পরও যখন কোন অবস্থাতেই শোল মাছগুলোকে খাওয়াতে পারছিলাম না। একদিন সন্ধ্যাবেলায় ওই পুকুরের পাড়ে বসেছিলাম। হঠাৎ করে একটি ছোট ব্যাঙ লাফ দিয়ে পুকুরে পড়ে গেল।
আর পড়ে যাওয়া মাত্রই কয়েকটি শোল মাছগুলো দৌড়ে এল। মুহূর্তের মধ্যেই ব্যাঙটিকে নিয়ে গেল। সেই মুহূর্তে আমিও পেয়ে গেলাম শোল মাছের খাবার। যারা খালেবিলে মাছ ধরে তাদের ছোট ব্যাঙ ধরে আনতে বললাম। প্রথম দিন প্রায় ৫ কেজি ব্যাঙ ধরে পাকা পুকুরে ছাড়া মাত্রই সমস্ত পুকুর জুড়েই এক ঝলকে তাণ্ডব হয়ে গেল। ৫ মিনিটের মধ্যেই সমস্ত ব্যাঙগুলোকে উদরে পুড়ে ফেলল ক্ষুধার্থ শোল মাছগুলো। প্রথম দিকে আমি এ দৃশ্য দেখে খুবই তৃপ্তি পাচ্ছিলাম। কিন্তু পর মুহূর্তে আমার মধ্যে একটা অনুশোচনা কাজ করল এই জন্য যে, এতগুলো ব্যাঙকে এ ভাবে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়া উচিৎ হয়নি। সপ্তাহখানেক শোল মাছকে খাবার না দিয়ে পরবর্তীতে আবার ব্যাঙ দিতে শুরু করি এই ভেবে যে, সবই একটি ধারাবাহিক পদ্ধতির মধ্যে চলে। বিলে এই মাছ থাকলে কোন না কোনভাবে ব্যাঙ বা অন্যকোন জলজ প্রাণী খেয়ে বেঁচে থাকতো। এভাবে নিয়মিত ব্যাঙ খাওয়ানোর পর মাছগুলো হয়ে উঠল বেশ মোটাতাজা। এরপরে এল বৈশাখ মাস। মাছগুলোর পেটে ডিম এল।
প্রজনের জন্য একজোড়া পুরুষ ও একজোড়া স্ত্রী শোল মাছ নির্বাচন করলাম। ২টি মাত্রায় পি·জি· হরমোন দিয়ে ইঞ্জেকশান করলাম। ২টি মাত্রাতেই ডিম দিল ঠিকই কিন্তু পুরুষ মাছের র্স্পাম পাওয়া গেল না। তাড়াতাড়ি পুরুষ মাছের পেট কেটে টেস্টিজ বের করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু অন্যান্য মাছের মত শোল মাছের টেস্টিজের আকার স্পষ্ট না থাকায় বুঝা যাচ্ছিল না কিছুই। অনেকটা ফুলের মত টেস্টিজে র্স্পাম থেকে কেটে তাড়াতাড়ি ডিমের সাথে পাখির পালকের সাহায্যে মিশিয়ে বোতল জারে দেয়া হল। কিন্তু ডিমগুলো বোতল জারে ভেসে উঠল। ডিমগুলো পানিতে ভেসে থাকাতে দেখে খুবই আশ্চর্য হলাম। এর আগে কখনও মাছের ডিম পানিতে ভেসে থাকতে দেখিনি।


এ যেন এক নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করলাম আমি। শোল মাছের ডিম পানিতে ভেসে থাকতে দেখে মনে হল এভাবে ডিম ভেসে থাকলে ডিম হয়তোবা ফুটবে না। সে ধারণা থেকে ডিমগুলো জার থেকে সরিয়ে সিস্টার্ণে নামিয়ে রাখলাম। পরে ডিমগুলোকে একটি লোহার দণ্ডের ফ্রেম বানিয়ে ফ্রেমের নীচে আটকিয়ে পানিতে ডুবিয়ে রাখা হল। এভাবে প্রায় ২ দিন পর দেখা গেল ফ্রেমের নীচে ডুবন্ত ডিমগুলো নষ্ট হয়ে গেছে কিন্তু বিচ্ছিন্নভাবে যে ডিমগুলো পানিতে ভাসমান ছিল সে ডিমগুলো থেকে কয়েকটি বাচ্চা পাওয়া গেল। এ দিকে একই সময়ে যে পুকুর থেকে মাছগুলোকে ধরে এনে পাকা পুকুরে রেখেছিলাম সে পুকুরে কয়েকটি মাছ ছিল এবং সেখানে প্রাকৃতিকভাবে ২টি বাইশ (শোল মাছের ঝাঁক) দেখলাম। তখনই পাকা পুকুরের সমস্ত মাছগুলোকে পূর্বের পুকুরে স্থানান্তর করলাম। মাছগুলো স্থানান্তরের ১৫ দিন পর প্রচুর পরিমানে শোল মাছের বাইশ (শোল মাছের পোনার ঝাঁক) দিতে লাগল। আর তখন এই বাইশগুলোকে ঠেলে জাল দিয়ে ধরে একের পর সিস্টার্ণে ভরতে লাগলাম। প্রথমে কোন খাবার খাচ্ছিল না। পরে চিংড়ির শুটকি ভালভাবে পাউডার করে দেয়ার পর ধীরে ধীরে খেতে শুরু করল। সপ্তাহখানেকের মধ্যে শোল মাছের বাচ্চাগুলো চিংড়ির শুটকি খেতে অভ্যস্ত হয়ে গেল। এভাবে ১ মাসে প্রায় ২/৩ লক্ষ শোল মাছের পোনা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু শোল মাছের চাষ পদ্ধতি জানা না থাকার কারণে বাজারজাত করা যায়নি। শেষ পর্যন্ত পাশের বিলে অবমুক্ত করা হল। অনেক টাকা বিনিয়োগের লোকসান ঘটিয়ে শোল মাছের পোনা উৎপাদনের পরিসমাপ্তি ঘটল। (চলবে)

- এ· কে· এম· নূরুল হক

“গাছ ও মাছে বাংলাদেশ” কিছু প্রস্তাবনা

“গাছ ও মাছে বাংলাদেশ” কিছু প্রস্তাবনা





বাংলাদেশের প্রধান সড়কগুলোর নির্মাণ বা উন্নয়নের জন্য রাস্তার দুপাশের মাটি কেটে খাল তৈরি করা হচ্ছে। এ খালের জন্য সামান্য জায়গা ছাড়া রাস্তার দুপাশের জমি কেবলমাত্র কৃষিজমি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য এই খাল ভরাট করা প্রয়োজন। খালের কারণে সড়ক ও মহাসড়কের আশপাশের জমি উন্নয়নের ছোঁয়া পাচ্ছে না। প্রাথমিক সমীক্ষামত সড়ক ও মহাসড়কের দুদিকের নীচু জমি বা ধানক্ষেত হতে ১ কিলোমিটার জমির মধ্যে ৩০০ মিটার নীচু জমি উঁচু জমিতে রূপান্তর করা প্রয়োজন। তা করার জন্য মাটি ভরাট করা হলে দেশজুড়ে কয়েক’শ কোটি একর উঁচু জমি পাওয়া যাবে। এই নীচু জমি উঁচু জমিতে রূপান্তর করতে গেলে আরও বেশ কয়েক’শ কোটি একর মাছ চাষের উপযোগী জলাভূমিতে রূপান্তরিত হবে। এই জলাশয়ের পানি দিয়ে প্রয়োজনে জমিতে সেচের ব্যবস্থা করা যাবে। বর্তমানে বাংলাদেশে বর্ষাকালে যে পানির প্রবাহ থাকে তা বিশেষ কয়েকটি বাঁধ ছাড়া অন্যকোন এলাকায় জমিয়ে রাখার মত কোন ব্যবস্থা নেই। বর্ষার পানিকে এসব খালে ধরে রাখা যেতে পারে।
বাংলাদেশের জেলা-উপজেলা ও আন্তঃনগর সংযোগের প্রধান সড়কগুলোর দুপাশের এক কিলোমিটার করে মোট দুকিলোমিটার নীচু জমি “গাছ ও মাছে বাংলাদেশ” নামক একটি প্রকল্পের আওতায় আনতে হবে। রাস্তার দুপাশে নীচু জমি যেখানে কেবল ধানচাষ হয় তার দুপাশ হতে ১ কিলোমিটার জমির মধ্যে প্রথম ৩০০ মিটার জমি বর্তমান রাস্তার উচ্চতা হতে ১ মিটার উঁচু করে মাটি ভরাট করতে হবে। এই ৩০০ মিটার নীচু জমি বা ধানক্ষেত ভরাট করতে পরবর্তী ৬০০ মিটার নীচু জমি বা ধানক্ষেত ২ মিটার গভীর করে কাটা হলে বর্তমান অবস্থান হতে ওই ৩০০ মিটার নীচু জমি ৪ মিটার উঁচু জমিতে রূপান্তরিত হবে। উঁচু জমির যে পাশ থেকে বছরের অধিকাংশ সময়ে সূর্যরশ্মি আসবে সে পাশে রবিশস্য এবং বাকি জমিতে কাঠের জন্য গাছ লাগাতে হবে।
যে এলাকা ৪ মিটার মাটি ভরাটের পরও পাশের রাস্তা হতে ১ মিটার উঁচু হবে না সে জমি প্রয়োজনে ২·৫ মিটার বা ৩ মিটার করে কাটা হবে তাহলে ৪ মিটারের পরিবর্তে উক্ত নীচু জমি ৫ বা ৬ মিটার উঁচু করা যাবে। ৩০০ মিটার উঁচু জমি পাওয়া যাবে এবং ৬০০ মিটার নীচু জমি বা জলাশয় পাওয়া যাবে। রাস্তার উভয় পাশে ১ মিটার উঁচু ৩০০ মিটার চওড়া বিশাল এলাকা পাওয়া যাবে। যা সড়ক বা মহাসড়কের পাশে বাধাহীনভাবে দীর্ঘ হবে। সেখানে রাস্তার পাশে গ্রাম বা উঁচু জমি পাওয়া যাবে সেখানে প্রকল্পটির সীমানা শেষ হবে। এছাড়া এলাকা ভিত্তিক ১ বর্গ কিলোমিটার করে আলাদা আলাদা প্রকল্প করা যাবে।
১০০০ মিটার চওড়া ১০০০ মিটার দীর্ঘ একটি প্রকল্পে প্রায় ২৪৬ একর জমি থাকবে যা থেকে ৭৪ একর উঁচু জমিতে রূপান্তরিত হবে এবং ১৫০ একর জলাশয় এ রূপান্তরিত হবে। প্রতি কিলোমিটার রাস্তার দুপাশে ১৫০ একর উঁচু জমি এবং ৩০০ একর পানি ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন মাছ চাষ উপযোগী জলাশয় পাওয়া যাবে।

এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে-
১· এলাকাভিত্তিক জমির মালিকরা সমবায় সমিতির সদস্য হয়ে তাদের জমির হারাহারি মালিকানার বিপরীতে সমিতির শেয়ার লাভের মাধ্যমে সমবায় সমিতির নামে জমির একক মালিকানা প্রদান করবেন। অথবা সকলে একসাথে তাদের জমি হারাহারি মালিকানার বিপরীতে উপযুক্ত ডেভলপার নিযুক্ত করে দীর্ঘ মেয়াদী চুক্তির মাধ্যমে “গাছ ও মাছে বাংলাদেশ” প্রকল্পের বাস্তবায়ন করবেন।
২· সরকার জমি রিকুইজিশন করে মালিকদেরকে ক্ষতিপূরণের টাকা প্রদান না করে জমির মালিকগণকে উন্নয়ন এর জন্য “গাছ ও মাছে বাংলাদেশ” নামক প্রকল্পের অংশীদার হিসেবে তাদের কাছে লীজ প্রদান করবেন। সংযুক্ত নকশা অনুযায়ী রাস্তার দুপাশে ২ কিলোমিটার উঁচু জমি ও খাল কাটার পানি কীভাবে থাকবে তা প্রদর্শিত হয়েছে। এই ১ বর্গ কিলোমিটার জমির মালিকরা নিজেদের তহবিল হতে অথবা ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে এই প্রকল্প চালাতে পারে অথবা আগ্রহী ব্যবসায়ীদের যৌথ উন্নয়নের অংশীদার করার মাধ্যমে এই প্রকল্পের কাজ শুরু করতে পরেন। রাস্তার পাশের উঁচু জমির এক অংশে গাছ লাগাতে হবে আর অপর অংশে পেঁয়াজ, রসুন ও অন্যান্য রবিশস্য উৎপাদন করা হবে। বিভিন্ন এলাকায় মাটি পরীক্ষা করে সঠিক ফসল উৎপাদন করার ব্যবস্থা করা হবে। বাকি ৬০০ মিটার পানিতে মাছ চাষ করা যাবে। এই কয়েক কোটি একর উঁচু জমি ও মাছ চাষের জন্য জলাশয় পূর্বের ধানক্ষেত্রে উৎপাদন অপেক্ষা অনেক বেশি টাকা আয় করবে। এই ৬০০ মিটার পানির পর আরও ২০ মিটার উঁচু দুটি পাড় ও ৫০ মিটার পানির আরও একটি জলাশয় থাকবে। এই উঁচু জমি ও গাছ লাগানোর কাজে লাগবে আর পানি সেচ কাজের জন্য ব্যবহৃত হবে। এই রিকুইজিশনকৃত জমির লীজ দেবে একটি সমবায় সমিতির নামে যেখানে রিকুইজিশনকৃত জমির মালিকরা তাদের জমির হারাহারি অংশ অনুযায়ী সমবায় সমিতির শেয়ারের মালিক হবেন। এই সমবায় সমিতি ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে নিজেরাই এই ৫/৬ কোটি টাকা মূলধন হিসেবে বিনিযোগ করে “গাছ ও মাছে বাংলাদেশ” প্রকল্পের বাস্তôবায়ন হবে। যদি সমবায় সমিতি নিজেরা ৫/৬ কোটি টাকার ব্যবস্থা না করতে পারে তাহলে রিয়েল এস্টেট ডেভেলাপারদেরে সাথে যৌথ উদ্যোগে এই প্রকল্প বাস্তôবায়ন এর ব্যবস্থা করতে হবে।
অনেকক্ষেত্রেই অশিক্ষিত জমির মালিকদের নিজস্ব উদ্যোগে এই সমবায় সমিতি করবে তার কোন নিশ্চয়তা নেই তাই এ উদ্যোগ বর্তমান সরকারকেই নিতে হবে। জমি অধিগ্রহণ করার পর জমির মালিকদের বাধ্য করতে হবে সমবায় সমিতির সদস্য হওয়ার জন্য। জমির মালিকরা সমিতির মাধ্যমে মালিক থাকবেন বিষয়টি সম্যকভাবে উপলব্ধি করতে পারলে অধিগ্রহণ বা যৌথ উন্নয়ন কোন বিষয়েই জমির মালিকরা বাধা সৃষ্টি করবেন না। অন্যথায় সরকারি আইন মোতাবেক রিকুইজিশন করে জমির ব্যবহার বিধি অনুযায়ী রাস্তার পাশের নীচু ধানক্ষেত কেবল মাত্র “গাছ ও মাছে বাংলাদেশ” প্রকল্প হিসেবে গড়ে তোলা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে মডেল হিসেবে প্রথমে যদি আমরা যে কোন জায়গায় রাস্তার পাশে ১০০০ মিটার X ১০০০ মিটার জমির ব্যবস্থা করতে পারি তাহলে নিম্ন বর্ণিত উপায়ে তা বাস্তবায়ন করা যাবে। প্রতি বর্গ কিলোমিটার জমিতে ১০০০ মিটিার X ১০০০মিটার =১০,০০,০০০ বর্গমিটার জমি পাওয়া যাবে। ১০০০ X ১০০০ = ১০,০০,০০০ বর্গমিটার।
প্রতি বর্গ কিলোমিটার জমিতে ৭০ একর উঁচু জমি এবং ১৪০ একর জলাশয় পাওয়া যাবে। প্রতি বর্গ কিলোমিটার জমিতে যৌথ উদ্যোগে জমির মালিকদের সাথে ডেভেলপারদের যৌথ উন্নয়নে ও যেতে পারেন। জমির মালিকরা নিজেরাই কো- অপারেটিভের মাধ্যমে জমির যৌথ মালিকানা সৃষ্টি করতে পারেন। উক্ত জমির মালিকের কো-অপারেটিভ যে কোন উপযুক্ত রিয়েল এটেষ্ট ডেভেলপারের সাথে চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে গাছ ও মাছ চাষের ব্যবস্থা করতে পারবেন।
একটি হিসেবে দেখা গেছে প্রতি বর্গ কিলোমিটার জমিতে মাটি কেটে ৩০০ X ১০০ মিটার মাটি ভরাট করতে প্রায় ৫ কোটি টাকার মত বিনিয়োগ করতে হবে। ৫ কোটি টাকা বিনিয়োগের পর এলাকা ভিত্তিক উঁচু জমির ধরন বুঝে বিশেষজ্ঞ দ্বারা মাটি পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় ও উপযুক্ত রবিশস্যসহ সকল প্রকার বৃক্ষ ও দীর্ঘ মেয়াদে গাছ রোপণ করার ব্যবস্থা করতে হবে। অপর দিকে ৬০০ X ১০০০ মিটার এর প্রকল্প ১৫/২০ বা এর অধিক সময় পর্যন্ত যৌথ উন্নয়নে উন্নত করে অধিক বৃক্ষ রোপণ, অনেক বেশি রবিশস্য প্রায় সকল প্রকার ফলের চাষ আমাদের বাংলাদেশে সম্ভব হবে।
শরীফ হোসেন চৌধুরী

শীতের সবজি ব্রোকলি


শীতের সবজি ব্রোকলি





ব্রোকলি বা সবুজ ফুলকপি এদেশে একটি নতুন কপিজাতীয় সবজি। শীতকালীন সবজির মধ্যে ব্রোকলি বর্তমানে আমাদের দেশে চাষ করা হচ্ছে। এর বৈজ্ঞানিক নাম Brassica oleracea var. italica.ব্রোকলি অন্যসব কপি জাতীয় সবজির চেয়ে উন্নত পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ। পুষ্টি বিজ্ঞানীদের মতে, প্রতি ১০০ গ্রাম খাবার উপযোগী ব্রোকলিতে ৫·৫ গ্রাম শ্বেতসার, ৩·৩ গ্রাম প্রোটিন, ২১০ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি, ৩৫০০ আইইউ ভিটামিন এ রয়েছে। এছাড়াও ব্রোকলিতে প্রচুর পরিমাণ আয়রন ও ক্যালসিয়াম বিদ্যমান। ব্রোকলি অত্যন্ত উপাদেয়, সুস্বাদু ও পুষ্টিকর একটি সবজি।
এটি চোখের রোগ, রাতকানা, অস্থি বিকৃতি প্রভৃতির উপসর্গ দূর করে ও বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। জমি তৈরিঃ ব্রোকলি চাষের জন্য জৈব সার সমৃদ্ধ, সুনিষ্কাশিত, উর্বর দো-আঁশ বা বেলে দো-আঁশ মাটিযুক্ত জমি নির্বাচন করা উত্তম। জমিতে মাটির পিএইচ মান ৬ থেকে ৭, দিনে গড় তাপমাত্রা ২০ থেকে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ব্রোকলি চাষের জন্য উত্তম। জমিতে কয়েকবার আড়াআড়ি ও গভীর চাষ দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করে নিতে হবে। এরপর আগাছা পরিস্কার ও জমি সমান করে বেড তৈরি করতে হবে। জাত নির্বাচনঃ ব্রোকলি আমাদের দেশে নতুন সবজি। কাজেই এখন পর্য- তেমন কোন ভাল জাত আমাদের দেশে নেই। উন্নত বিশ্বের বেশ কয়েকটি জাত যেমন- প্রিমিয়াম ক্রস, গ্রীন কমেট, জুপিটার প্রভৃতি জাতের ব্রোকলি চাষ করা যায়। লালতীর সীডস লিমিটেড ‘লিডিয়া’ নামে ব্রোকলির একটি জাত বাজারজাত করছে, যা আমাদের দেশের আবহাওয়া উপযোগী। জাতটি দ্রুত বর্ধনশীল, মাঝারি আকৃতির, তাপ সহিষ্ণু ও রোগ প্রতিরোধী, দেখতে আকর্ষণীয় ও খেতে সুস্বাদু।বীজ বপনঃ আমাদের দেশের আবহাওয়ায় ব্রোকলি চাষের উত্তম সময় হল আশ্বিন থেকে পৌষ মাস। চারা রোপণের আগে বিঘাপ্রতি (৩৩ শতক) প্রায় ৫০ গ্রাম বীজ বপন করে বীজতলায় চারা তৈরি করতে হবে। এরপর মূল জমিতে চাষের জন্য বিঘাপ্রতি ৬ হাজার চারা রোপণ করতে হবে। প্রায় ৪ থেকে ৫ সপ্তাহ বয়সের চারা সারি থেকে সারি ৫৫ সে·মি· ও চারা থেকে চারা ৪৫ সে·মি· দূরত্বে রোপণ করলে ভাল ফল পাওয়া যায়।

পাশাপাশি দুটি বেডের মাঝে ৩০ সে·মি· চওড়া এবং ১৫ সে·মি· গভীর নালা রাখতে হবে।সার প্রয়োগঃ ব্রোকলির উত্তম ফলন পেতে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান অবশ্যই দরকার। এজন্য জমি তৈরির সময় ও পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় পরিমাণ জৈবসার ও রাসায়নিক সার প্রয়োগ করতে হবে। ব্রোকলি চাষের মূল জমি তৈরির সময় বিঘাপ্রতি ২ টন পচা গোবর বা কম্পোস্ট সার, ২৫ কেজি খৈল, ২৫ কেজি ইউরিয়া, ১৫ কেজি টিএসপি, ২০ কেজি এমওপি সার প্রয়োগ করতে হবে। এছাড়াও পরিমাণমত জিপসাম, জিংক ও বোরন সার এবং বিঘাপ্রতি ২ কেজি হারে রুটোন বা অন্য কোন শিকড় বর্ধনকারী হরমোন প্রয়োগ করতে হবে। জমি তৈরির সময় জিংক ও বোরন না প্রয়োগ করে চারা লাগানোর ২০ থেকে ২৫ দিন পর প্রতি ১০ লিটার পানিতে ১০ গ্রাম লিবরেল জিংক ও ২০ গ্রাম লিবরেল বোরন একত্রে মিশিয়ে স্প্রে করা যায়। তবে রাসায়নিক সারের পরিবর্তে জৈব সার ব্যবহার করা উত্তম। অন্যান্য পরিচর্যাঃ ব্রোকলির চারা লাগানোর পর বেশকিছু বাড়তি পরিচর্যা করতে হবে। জমিতে আগাছা হলে সাথে সাথে নিড়ানি দিতে হবে। মাঝে মাঝে নিড়ানি দিয়ে মাটি আলগা করে দিতে হবে। এছাড়া সূর্যালোকে উম্মোচিত থাকলে ফুল হলুদাভ বর্ণ ধারন করতে পারে। তাই চারদিকের পাতা দিয়ে ফুল ঢেকে দিতে হয়, যা ব্লাচনিং নামে পরিচিত। অনেক সময় আগাম জাতের ব্রোকলি দেরিতে রোপণ করলে বা জমিতে নাইট্রোজেন পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি হলে ফুল ছোট হয়ে যেতে পারে। এসময় ইনডোল বিউটারিক এসিড জাতীয় জৈব হরমোন স্প্রে করলে বা ইউরিয়া উপরি প্রয়োগের পর সেচ দিলে উপকার পাওয়া যায়।ফসল সংগ্রহ ও ফলনঃ চারা রোপণের দুই মাসের মধ্যে ব্রোকলির অগ্রীয় প্রোপুষ্প মঞ্জুরী খাওয়ার জন্য সংগ্রহ করা যায়। তবে সঠিকমানের জৈব হরমোন ব্যবহার করলে প্রায় ১০ দিন আগে ফসল সংগ্রহ করা যায়। প্রায় তিন ইঞ্চি কাণ্ডসহ ধারালো ছুরি দিয়ে ফুল কেটে সংগ্রহ করতে হয়। এর ১০ থেকে ১২ দিন পর পর্যায়ক্রমে বোঁটাসহ কক্ষীয় প্রোপুষ্পমঞ্জুরী সংগ্রহ করতে হয়। সঠিক পরিচর্যা করলে বিঘাপ্রতি ২থেকে ২·৫ টন ফলন পাওয়া যায়।

কৃষিবিদ মোঃ কামরুল আহসান ভূঁইয়া